ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ , ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​‎জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস, অনলাইন বেটিংয়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ০৭:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩০-০৬-২০২৬ ০৭:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন
​‎জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস, অনলাইন বেটিংয়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড ​ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এ আইনের মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ‘The Public Gambling Act, 1867’ রহিতকরণ করা হয়েছে। আইনে জুয়া, অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং (বাজি বা পণ), বাজিকর (Bookmaker), ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট, ভিপিএনসহ মোট ২৪ ধরনের বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

একই সঙ্গে অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গত ২৩ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। পরে বিলটি পরীক্ষা করে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটির সুপারিশের পর মঙ্গলবার বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান ‘The Public Gambling Act, 1867’ দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো আইন এবং বর্তমান সময়ের প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার ধরন মোকাবিলায় এটি আর যথেষ্ট নয়। সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জুয়া নিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে আইনটি যুগোপযোগী করে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, বর্তমানে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া, ভুয়া সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, বায়োমেট্রিক জালিয়াতি, ভিপিএন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া, অর্থপাচার ও প্রতারণা দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জননিরাপত্তা এবং তরুণ সমাজের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় আধুনিক ও সমন্বিত আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হওয়ায় নতুন আইনটি আনা হয়েছে।

নতুন আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১৪ ধরনের অপরাধ নির্ধারণ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া পরিচালনা, অনলাইন বেটিং, জুয়ার স্থান পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবহার, জুয়ার সামগ্রী প্রস্তুত, সংরক্ষণ, বিক্রি, বিতরণ বা ব্যবহার, বাজিকর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা, ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং, জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনা, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস বা ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট ও বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনা এবং জুয়ার অর্থ লেনদেন, অর্থপাচার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার।

আইনে সাধারণ জুয়ার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অনলাইন বেটিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। জুয়ার স্থান পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও চার লাখ টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি আদালতের আদেশে সংশ্লিষ্ট ভবন, কক্ষ, যানবাহন, সার্ভার অবকাঠামো বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। জুয়ার সামগ্রী সংরক্ষণ, প্রস্তুত, সরবরাহ, বিক্রি, বিতরণ, আমদানি বা ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং আদালতের মাধ্যমে এসব সামগ্রী বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। বাজিকর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা বা ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। একইভাবে জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটিকে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।

ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস, ক্লাউড অবকাঠামো বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীন সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate Offence) হিসেবে গণ্য হবে।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি, করপোরেট সংস্থা, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার, পেমেন্ট গেটওয়ে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, অংশীদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে, যদি না তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তার অজ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে এবং তা প্রতিরোধে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিকেও পৃথকভাবে অভিযুক্ত করা যাবে এবং আদালত প্রয়োজনে তাদের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করতে পারবেন। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

নতুন আইনে অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ, সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, ডিভাইসসহ অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে, অন্য অপরাধের বিচার হবে এখতিয়ারসম্পন্ন ফৌজদারি আদালতে। আইনের অধীন সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে। তদন্তের ক্ষেত্রে সাব-ইন্সপেক্টরের নিচের পদমর্যাদার কোনো পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না এবং প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করা যাবে।

এছাড়া সরকার বা সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে জুয়া বা বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ, চ্যানেল এবং ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম ব্লক, অপসারণ বা নিষিদ্ধ করতে পারবে। জুয়ার অর্থে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস, পেমেন্ট গেটওয়ে, ডিজিটাল ওয়ালেট ও ক্রিপ্টো ওয়ালেট বন্ধের নির্দেশও আদালত দিতে পারবেন। পাশাপাশি জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং, অর্থপাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ প্রণয়ন, এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম বাস্তবায়ন, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের মতে, নতুন এই আইন কার্যকর হলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া, অনলাইন বেটিং, ডিজিটাল আর্থিক প্রতারণা ও অর্থপাচার প্রতিরোধে কার্যকর আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ